এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজমঃ তত্ত্ব ও প্রয়োগ

এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজমঃ তত্ত্ব ও প্রয়োগ

সমাজের চলমান আভ্যন্তরীণ নানা প্রকার দ্বন্দ্ব ও অসঙ্গতি দূরকরার জন্য যখন মানুষের প্রয়োজন তিব্রতর হয়, তখনই সমাজবাদের উদ্ভব হয়, যা মানুষকে নয়া পরিবেশে নয়া সামাজিক সম্পর্কের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। এটা প্রথমিক ভাবে একটি ক্ষদ্র বুদ্বিজীবী মহলকে প্রভাবিত করে যারা শ্রমিক নয়, বরং সমাজের সুবিধা প্রাপ্ত শ্রেনীর লোক। তাঁরা প্রভাবিত হয়েছিলেন মূলত একটি মহৎ ভাবনা ও মানুষের প্রতি তিব্র ভালোবাসা থেকে।

গ্রন্থঃ এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজমঃ তত্ত্ব ও প্রয়োগ

মুল লিখকঃ রুডলফ রকার, অনুবাদঃ এ কে এম শিহাব

দ্বিতীয় অধ্যায়ঃ আধুনিক শ্রমিক আন্দোলনের সূচনা ও প্রলেতারিয়েতের সংগ্রাম (প্রথম কিস্তি)

সমাজের চলমান আভ্যন্তরীণ নানা প্রকার দ্বন্দ্ব ও অসঙ্গতি দূরকরার জন্য যখন মানুষের প্রয়োজন তিব্রতর হয়, তখনই সমাজবাদের উদ্ভব হয়, যা মানুষকে নয়া পরিবেশে নয়া সামাজিক সম্পর্কের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। এটা প্রথমিক ভাবে একটি ক্ষদ্র বুদ্বিজীবী মহলকে প্রভাবিত করে যারা শ্রমিক নয়, বরং সমাজের সুবিধা প্রাপ্ত শ্রেনীর লোক। তাঁরা প্রভাবিত হয়েছিলেন মূলত একটি মহৎ ভাবনা ও মানুষের প্রতি তিব্র ভালোবাসা থেকে। সাধারন মানুষের মুক্তি, সামাজিক দ্বন্দ্বের নিরসন, ও সুন্দর ভবিষ্যত গড়ার জন্য সমাজবাদের প্রবর্তন হয়। উল্লেখ্য যে, সেই সুবিধা প্রাপ্ত শ্রেনীর নিকট সমাজবাদ ছিলো একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন; তাই তাঁরা এই আন্দোলনের বার্তা সেই সমাজের লোকদের নিকট সরল, সরাসরি ও নৈতিক আবেদন হিসাবে প্রচার করতে থাকেন। তাঁদের প্রত্যাশা ছিলো সমাজ সহজেই এটা গ্রহন করবে।
কিন্তু সেই ধারনা বা প্রচার কোন আন্দোলন সৃজন করতে পারে নাই; তাঁরা কেবল তাঁদের চলমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কাজে নামেন, তাঁরা তাঁদের জীবনের বিশেষ অবস্থার কথা চিন্তা করে বুদ্বিবৃত্তিক উদ্যোগ নেন। আন্দোলন মানুষে সামাজিক জীবনের তাতক্ষনিক ও অতি প্রয়োজনীয় বিষয় গুলোকে সামনে রেখে এগোয়। তা এগিয়ে যাবার শক্তি, বিজয়ী হবার যৌক্তি, এবং বুদ্বিবৃত্তিক চর্চার ক্ষেত্র কামনা করে। সমাজবাদের জন্য তাঁরা শ্রমিক আন্দোলনকে যুক্ত করে, এবং মেধা ও যুক্তি দিয়ে তাঁর একটি আকৃতি দেয়া হয়। সমাজবাদি আন্দোলন শ্রমিক আন্দোলনের ভেতর থেকে সৃষ্টি করা হয়নি; বরং এটা সৃজন হয়েছে তাঁর বাহির থেকে। বর্তমান পুঁজিবাদী সমাজের ভেতর সামাজিক পুর্গঠনের লক্ষ্যে এই আন্দোলনের সূচনা হয়। এই আন্দোলনের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিলো মানুষের রুটির ব্যবস্থা ও শ্রমজীবী মানুষের জীবন যাত্রার সুরক্ষা নিশ্চিত করা ।

আজকের শ্রমিক আন্দোলন ইংল্যান্ডের অষ্টাদশ শতাব্দির শিল্প বিপ্লবের নিকট ঋণী। এই আন্দোলন সেখানে উৎপত্তি হলে ও পরবর্তীতে প্রায় সকল মহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। সেই যে “ম্যানুফ্যাক্সারিং” পদ্বতীর উদ্ভব হলো যা পরবর্তী সময়ে শ্রমিকের কাজের দক্ষতাকে নানা ভাবে বিভক্ত করে উৎপাদন ব্যবস্থায় এক আমূল পরিবর্তন সাধন করে দেয়। সাধারন ভাবে তখন মানুষের চেয়ে যন্ত্র অধিকতর গুরুত্ব পেতে থাকে। কাপড় ও সুতা তৈরীর জন্য যে মেশিন উদ্ভাবন হয় যা শ্রমিকদের জন্য এক অভাবনীয় বিপ্লবের সূচনা করে । এই স্বয়ংক্রিয় মেশিন অনেক শ্রমিকের কাজ একাই করে দিতে পারে, ফলে শ্রমিকদের কাজ হারাবার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।

জেমস ওয়াট উদ্ভাবিত ষ্টীম ইঞ্জিন আবিস্কার, উৎপাদন কারীদেরকে বাতাস, পানি, ও ঘোড়ার শক্তির উপর নির্ভরতা কমিয়ে দেয়। সেই সময় থেকেই উৎপাদন প্রক্রিয়ায় এক ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসে। এটা নয়া নয়া উৎপাদনের ক্ষেত্র ও তৈরি করে দেয়। আধুনিক ফ্যাক্টরি, প্রদর্শনী দোকান, উন্নত বিক্রয় কেন্দ্রের উন্মেষ ঘটে সেই সময়ে। বিশেষ করে বস্ত্র উৎপাদন খাতে ও অন্যান্য খাতে অল্প সময়ের মধ্যেই একটা প্রচণ্ড বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করে ফেলে উন্নত ইউরূপীয় দেশ সমূহে। শক্তির ব্যবহার করে লোহা ও কয়লার ব্যবহারে এক বৈপ্লবিক অগ্রগতি সাধন করে তাঁরা। শ্রমিকদের কর্মপরিবেশে আসে এক নয়া আবহ। ক্রমে বড় বড় শিল্প কারখানের জন্ম হতে থাকে, আর তাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে নানা স্থানে শহর নগর । ১৮০১ সালে বার্মিং হামের লোক ছিলো মাত্র ৭৩,০০০ এবং ১৮৪৪ সালে এসে দাঁড়ায় ২০০,০০০ আর সেফিল্ডে ৪৬,০০০ হাজার থেকে উন্নিত হয় ১১০,০০০ তে। এই ভাবে সমগ্র দুনিয়ার শিল্পের সাথে সাথে শহর নগরের আকার ও অধিবাসিদের সংখ্যা ব্যাপক হারে বৃদ্বি পেতে থাকে।

প্রতিটি ফ্যাক্টরিতেই দরকার হয় কাজের জন্য মানব খাদ্যের । গ্রামীন অঞ্চল দরিদ্র হতে থাকে, পানির শ্রুতের মত মানুষ নগর মূখী শহর মূখী হতে থাকে। মানুষের উপর অভিশাপ হয়ে নেমে আসে ‘এনক্লোজার আইন’ । সেই আইনের বলে কারখানার জন্য কৃষকের জমি অধিগ্রহন চলতে থাকল আর সাধারন মানুষকে ভিক্ষুকের স্তরে নামিয়ে দিল শিল্পায়নের উদ্যোগ। ১৭০২-১৭১৪ সালে রানী এনের সময় কাল থেকে পদ্বতীগত ভাবে মানষের সম্পদ চুরির বন্দবস্ত করা হয়। ১৮৪৪ সালে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের এক তৃতীয়াংশ কৃষি জমি অধিগ্রহন করে নেয়া হয়েছিল। ১৭৮৬ সালে যেখানে স্বাধীন ভূমি মালিক ছিলেন প্রায় ২৫০,০০০ জন, তা মাত্র ত্রিশ বছরে কমে এসে দাঁড়ায় ৩২,০০০ জনে।

নয়া ধরনের যন্ত্রপাতি উৎপাদনে অকল্পনীয় ভাবে তথাকথিত জাতীয় সম্পদ বৃদ্বি করে দেয়। কিন্তু সেই সম্পদের মালিক হয়ে বসে স্বল্প কিছু সুবিধা প্রাপ্ত জন গুষ্টি। অন্যদিকে, চলতে থাকল শ্রমজীবী মানুষের উপর সীমাহীন শ্রম শোষণ। দ্রুত তাঁদের জীবন যাত্রা নিচের দিকে নামতে থাকে, গ্রাস করতে থাকে চরম দারিদ্রতা, দেখা দেয় নানা ভাবে বিদ্রোহ। সে সময়ের কারখানা সমূহের শ্রমিক ও কাজের পরিবেশ সংক্রান্ত রিপোর্ট পড়লে মানুষ হতাশায় ও বিষাদে পরিপূর্ন হয়ে যাবে। যা কার্ল মার্ক্স তাঁর পুঁজি গ্রন্থে; ইউজিন তাঁর ডি লা মিজারি দেস ক্লাসেস লেভুরিয়াসেস এন এংলিটারি এট ফ্রান্স, এবং এঙ্গেলস তাঁর ইংল্যান্ডের শ্রমিকদের অবস্থা নামক গ্রন্থে এই বিষয় বিশ্লেষণ মূলক আলোচনা করেছেন। এ ছাড়া ইংক্যান্ডের অন্যান্য লিখকদের লিখায় ও তৎকালীন চিত্র ফোটে উঠেছে। যা সত্যি মানব জাতির ইতিহাসে অত্যন্ত মর্মান্তিক চিত্র।

মহান ফ্রান্স বিপ্লবের মাত্র কিছু দিন আগে স্বনাম ধন্য লিখক আর্থার ইউং ফ্রান্সে ভ্রমন করেন, তিনি তাঁর ভ্রনম কাহিনীতে লিখেন, ফ্রান্সের পল্লী এলাকার মানুষেরা প্রায় পশুরমত জীবন যাপন করছে, তাঁরা তাঁদের চরম দারিদ্রতার কারনে সকল মানবীয় গুনাবলী হারিয়ে ফেলছে। পুঁজিবাদের এই উষা লগ্নে শিল্প শ্রমিকগন তাঁদের জ্ঞান বুদ্বি হারিয়ে অত্যন্ত মানবেতর জীবন যাপনে বাধ্য হচ্ছে।

অগনিত শ্রমিক অত্যন্ত নোংরা পরিবেশে প্রায় অন্দ্বকার ঘরে যেখানে জানালানেই এমন কি আলো আসার মত গ্লাস ও লাগানো নেই, সেখানে শ্রমিকগন বস্ত্র কারখানায় চৌদ্দ পনর ঘণ্টা এক নাগারে কাজ করতে বাধ্য হয়। তাঁদের জন্য স্বাস্থ্য ও জীবনের সুরক্ষার কোন যন্ত্রপাতি বা ঔষধপত্র কিছুই রাখা নেই। আর যে পরিমান বেতন দেয়া হয় তা একেবারেই পর্যাপ্ত নয় এমনকি তাতে তাঁদের খাওয়া পড়ার ব্যবস্থাও হয়না বললেই চলে। সপ্তাহ শেষে এই কারখানা নামক জাহান্নাম থেকে কয়েক ঘন্টার জন্য তাঁরা যে ছুটি পায় তাতে এই দুঃখের অবস্থা থেকে ভুলে থাকার জন্য অস্বাস্থ্যকর মধ্যপান করে থাকে। এই পরিস্থির কারনে স্বাভাবিক ভাবেই সরকারী অনুমোদনেই নানা জায়গায় বেশ্যালয় ও পানশালা গড়ে উঠে । তাঁর সাথে সাথে অপরাধ ও বাড়ে। মানুষের যখন নৈতিক অধঃপতন হয়, তখন সে সকল কিছুই করতে পারে, এমনকি নিকৃষ্ট ধরনের কাজ করতে ও তাঁর কোন প্রকার লজ্জা হয়না ।

কারখানায় দাসত্বের জীবন যাপন ও নিকৃস্টতম পরিস্থিতিতে মালিকেরা ততাকথিত ট্র্যাক ব্যবস্থার প্রবর্তন করে তাদেরকে দৈনিন্দিন জীবন যাপনের জন্য অতি নিম্নমানের পন্য কিনতে বাধ্য করা হয়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গিয়েছিলো যে, শ্রমিকগন তাঁদের অনেক অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে ও তাঁদের কঠোর শ্রমের মজুরী থেকে মূল্য পরিশোধ করতে বাধ্য হচ্ছিলো। যেমন, ডাক্তার, ঔষধ, ও অন্যান্য পন্য কিনার জন্য তাদেরকে টাকা দিতে বাধ্য করা হত। সেই সময়ের লিখকগন লিখেছেন যে, একজন মাকে তাঁর মৃত সন্তান কবর দিতে হলে ও রক্ষী এবং কবর খননকারী কে টাকা প্রদান করতে হত ।

সেই সময়ের আইনী শোষন ও মানুষের শ্রম শক্তির শোষণ কেবল পূর্ন বয়সী নারী পুরুষের মাঝে সিমাবদ্ব ছিলো না । তখন এমন কিছু মেশিন পত্র আবিস্কার হয় যা চালনা করার জন্য তেমন শক্তির দরকার পরত না । অল্প কিছু নড়াচড়া করলেই কাজ হয়ে যেত। তাই পুঁজিবাদীদের লক্ষ্য পরিণত হল প্রলেতারিয়েত শিশু সন্তানেরা, তিন চার বছরের শিশুদেরকে ও শিল্প কারখানার অন্দ্বকার প্রকোষ্ঠে নিয়ে আসা হয় কাজের জন্য, ব্যবসায়ের জন্য এবং উৎপাদনের জন্য । শিশু শ্রমিকদের ইতিহাস, এর আগে এত নির্মম কোথাও ছিলো না, আর এটা ছিলো পুঁজিবাদের ইতিহাসে একটি গভীর অন্দ্বকার যুগ। এটা স্পষ্ট করে দেয় খৃস্টীয় ব্যবস্থাপকগন কত নির্মম ছিলো। এঁরা মুনাফার জন্য, ব্যবসায়ের জন্য, জনগণকে শোষণ করার জন্য কত নিচে নামতে পারে । সিমাহীন কষ্টের পরিবেশে কাজ করতে গিয়ে অগণিত শিশুর মৃত্যু হতে থাকে, তা দেখে রিচার্ড কার্লাইল খুবই দুঃখিত হয়ে উক্তি করেন, “ বেথেলহামের নিরাপরাধ শিশুদের হত্যা করার রেওয়াজ আবার ফিরে এসেছে”। পার্লামেন্টে আইন হবার পর ও ফ্যাক্টরি মালিকগন সেই বাস্তবায়নে প্রচুর সময় নেয় ।

রাষ্ট্র ফ্যাক্টরি মালিকদেরকে শোষণ করার জন্য ও নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তির লক্ষ্যে ব্যবস্থাপনা বিভাগকে ব্যাপক সুযোগ দিয়েছে । রাষ্ট্রের লক্ষ্যই ছিলো কম বেতনের শ্রমিক সর্বরাহ করা। উদাহরন হিসাবে বলা যায়, ১৮৩৬ সালে যে কাল আইন টি প্রনয়ন করা হয় তাতে ইংরেজ শ্রমিক সহ শ্রমিকের মাঝেই অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। সকল পুরাতন আইন কানুন ই প্রনয়ন করা হয়েছিলো রানী এলিজাবেথের সময় কালে, যার লক্ষ্য ছিলো মানুষের উপর ইংল্যান্ডের ধানবীয় চরিত্রটি বুঝিয়ে দেয়া । এই ধানবীয় আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে প্রায় গরীবের সম্পদের তিন ভাবের এক ভাগ খরচ করতে হত। কিন্তু যারা ভালো মনের অধিকারী মালিক তাঁরা তাঁদের আয়ের এক তৃতীয়াংশ দিয়ে দিতে চায়নি। তাঁরা মানবেতর জীবন যাপন কারী লোকদের জন্য কিছু সুবিধা প্রদানের চিন্তা করতে থাকেন, এবং আইনগত পরিবর্তনের জন্য প্রস্তাব করেন । পরিস্থিতিগত কারনে বেশ কিছু আইন কানুন নতুন করে প্রনয়ন করা হয় এবং অনেক পুরাতন আইনের সংশোধন করা হয় ।

নয়া আইনে দারিদ্রতাকে অপরাধ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে, এবং কেহ যেন নিজের স্বতঃস্ফুর্ততার কারনে পিছিয়ে না পড়েন সেই দিকে তাকিদ করা হয়েছে। নয়া আইন কানুনে ম্যালতাসিয়ান ভাবধারাকে নানাভাবে জনগনের সামনে হাজির করার চেষ্টা করা হয়েছে, মালিক পক্ষকে দিয়ে এর প্রশংসা করা হয়ে, বলা হয়েছে এই পদ্বতী একটি বিশাল উদ্ভাবন। ম্যাথিউ, যিনি জন সংখ্যা তত্ব নিয়ে কাজ করার জন্য খুবই প্রশংসিত তিনি গডউনের রাজনৈতিক বিচার নামক গ্রন্থে এই ব্যবস্থার জবাব দিয়েছেন। তিনি এই ব্যবস্থাকে খুনের নামান্তর বলে অভিহিত করে বলেছেন, দরিদ্রদের পরিবারে নয়া মুখের আগমনকে বারিত করার অধিকার কারো থাকা উচিৎ নয়। ‘জন্ম নিয়ন্ত্রনের মত’ এই ধরনের দৃষ্টি ভংগী, অবশ্যই, শিল্প কারখানার মালিকদের জন্য মিলিত ভাবে সীমাহীন শোষণের পথ করে দেয়াই ছিলো নয়া আইনের প্রধান লক্ষ্য ।
নয়া আইন দরিদ্র জনগণের জন্য আলাদা ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য প্যারিস কর্তৃপক্ষের বাহিরে রাষ্ট্র পক্ষের নিয়োজিত একটি আলাদা কমিটি গঠন করা হয়। শ্রমিকদেরকে আর্থিক সহায়তা দান বা বর্তমান কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ উন্নয়নের জন্য পদক্ষেপ নেয়া হয়, সেই ব্যবস্থাটি ও ছিলো গনমানুষের জন্য ভয়ঙ্কর, তাই লোকেরা সেই নয়া আইনকে বলতে থাকল “ গরীবের ব্যাস্টাইল আইন”। মানুষের মধ্যে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয় যে, তাঁরা ভাবতে থাকেন, যাদের ভাগ্য খারাপ তারাই বাধ্য হয়ে সেই কলখানায় বন্দ্বির মত আত্মসমর্পন করে। যেখানে তাঁদেরকে অত্যাচার ও শাস্তি ভোগ করতে হয় । অর্থাৎ কর্ম ক্ষেত্র হয়ে পড়ল বন্দ্বিশালা । সেই কর্মক্ষেত্র সমূহ ছিলো প্রচণ্ড নিয়ম শৃংখলায় পরিপূর্ন, কেহ নূন্যতম নিয়ম ভঙ্গ করলেই নেমে আসত সীমাহীন শাস্তির খড়গ। প্রতিটি ব্যাক্তির জন্য নির্ধারিত থাকত তাঁর কাজ; যদি সে তাঁর কাজটি কোন কারনে করতে ব্যার্থ হত হবে তাঁর ভাগ্যে খাদ্য জোটত না, দেয়া হত ব্যাপক শাস্তি। জেল খানার বন্দ্বিদের জন্য খুবই নিম্নমানের ও স্বল্প পরিমান খাবার শ্রমিকদের জন্য বরাদ্ব করা হত । চিকিতসার জন্য তেমন কোন ব্যবস্থা ছিলো না। তাঁদের শিশুরা পর্যন্ত অত্মহত্যার পথ বেচে নিত । শ্রমিকদের অবস্থা এমন ভাবে তৈরি করা হয় যে শ্রমিকদেরকে তাঁদের পরিবার পরিজন থেকে পৃথক করে দেয়া হয়। তাঁদের আপনজন ও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দেখা করতে পারত না । দেখা করলে ও তাঁদের পর্যবেক্ষকদের সামনে দেখা করতে হত । মালিক পক্ষের প্রতিটি নির্দেশনা ও পদক্ষেপই ছিলো শ্রমিকদেরকে সন্ত্রস্ত্র করা রাখা, যেন সকলেই নিজেদেরকে উদ্বাস্তুদের মত শিকরহীন ভাবতে থাকে। আর এটাই ছিলো নয়া আইন কানুনের আসল মতলব। বৃহৎ শিল্প কারখানা ও যান্ত্রিক ব্যবস্থার ফলে হাজার হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়ে, যারা বস্ত্র শিল্পের উপর নির্ভরশীল ছিল নিজেদের জীবন জীবিকা নির্বাহের জন্য। সেই সময়ে প্রায় ৮০,০০০ হস্তচালিত শ্রমিক ছিলেন যারা প্রায় ভিক্ষুকে পরিণত হন। তখন শ্রমের বাজেরে মারাত্মক মন্দ্বা দেখা দেয়, মালিক পক্ষ শ্রমিকদের মজুরী ব্যাপক হারে কমিয়ে দেয় ।

সেই যন্ত্রনাদায়ক পরিস্থিতিতে সামাজিক ভাবে এক নয়া শ্রেনীর জন্ম হল, ঐতিহাসিক ভাবে যাদের তেমন কোন উল্লেখ নেইঃ এঁরা হলো আধুনিক শিল্প প্রলেতারিয়েতঃ এত দিন যারা ছিলেন ক্ষুদ্র কুটির শিল্প শ্রমিক, স্থানীয় ভাবে মানুষের চাহিদা মেটাতেন, এবং তুলনা মূলক ভাবে সুন্দর ও সুখী জীবন যাপন করতেন, তাঁদের জীবন যাত্রায় তেমন কোন বার্তি ঝামেলা বা উপদ্রপ ছিলো না । সে তাঁর শিক্ষানবিসি হিসাবে সেবা দিত, একজন ভ্রমণকারীর মত ছিলো তাঁর জীবন। কিন্তু পড়ে পুজির করাল গ্রাস এসে সকল কিছু বদল করে দেয়। মানুষ মেশিনের সাথে সাথে পুজির কারায়ত্বে চলে চায় –আর হারিয়ে ফেলে স্বীয় স্বাধীনতা। সেই যুগটাকে বলা হয়ে থাকে মেশিনের যুগ। মানুষ মানুষের জন্য কাজ করত, এবং প্রকৃতিক বৈচিত্রময় পরিবেশে নিজের ইচ্ছায় অন্যের খুশির জন্য নিজেকে নিবেদন করত, কিন্তু মেশিনের যাঁতাকলে সকল কিছুতে এক আমূল পরিবর্তন এসে হাজির হয়।

পুঁজিবাদ বিকাশের সূচনা লগ্নে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শিল্পের মালিকেরা নিজেদের উৎপাদিত পন্য শহরের বড় বড় পুঁজিপতি ব্যবায়ীদের নিকট বিক্রি করে দিতে থাকে, যা সত্যিকার ভাবে প্রলেতারিয়েতের নাগালের বাইরে ছিলো। শিল্প, বিশেষ করে বস্ত্র শিল্প, যাদের উৎপাদন কেন্দ্র ছিলো গ্রামীন জেলা শহর সমূহ, আগের ক্ষুদ্র শিল্প সমূহ ছিলো ছোট জায়গা নিয়ে যার ব্যবস্থাপনা ও ছিলো সহজতর। কিন্তু বৃহৎ শিল্প বিশাল জায়গা নিয়ে গড়ে উঠার কারনে ব্যস্থাপনায় ও আসে ব্যাপক পরিবর্তন ও জটিলতা । ফলে পন্যের চাহিদার সাথে সংগতি রেখে সর্বরাহ একটি বড় বিষয় হয়ে দেখা দেয় । তা করতে গিয়ে ও শ্রমিকদের সুরক্ষার নিয়ম অনেক ক্ষেত্রেই সংকটের সৃষ্টি করে ।